LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

স্কুলে পড়ার সময় একটা প্রশ্ন আমাদের সবাইকেই শুনতে হয়। ‘বড় হয়ে কী হতে চাও?’ সেই সময় থেকেই ফারিয়েল জানতেন তিনি পাইলট হতে চান। বড় হওয়ার পরে আমাদের ছোটবেলার লক্ষ্য কত-শত-বার বদলে গেছে নিজেরাই হয়তো ভুলে গেছি, কিন্তু ফারিয়েল আহমেদ তার ছোটবেলার ইচ্ছা ঠিকই পূরণ করেছেন। বড় হয়ে তিনি পাইলটই হয়েছেন। কাজ করছেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে। সম্প্রতি পদোন্নতি পেয়ে হয়েছেন দেশের সবচেয়ে বড় এয়ারক্রাফট ‘বোয়িং ৭৩৭’ এর ক্যাপ্টেন।

ফারিয়েলের বেড়ে ওঠাও অবশ্য আকাশছোঁয়া মানুষদের মাঝে। বড়ভাই অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। মেজভাই ছিলেন পাইলট। যার সাথে মনের মিল হলো, সংসারের গাঁটছড়া বাঁধলেন, স্বামী জাহিদ হোসেনও একজন পাইলট। দুজনের মিষ্টি মেয়েটা, ফারিজা, সেও বড় হচ্ছে আকাশ থেকে নেমে আসা ছোট্ট পরীর মতোই।

গুণের নামতার মতো সহজ শোনালেও, ফারিয়েলের পথচলা সবসময় সহজ ছিল না। প্রতিটি মেয়ের একটি নিজস্ব স্ট্রাগলের গল্প থাকে। সংসার, প্রফেশন কিংবা সামাজিক যোগাযোগ, মেয়েদের সবসময় নিজের জায়গাটা অর্জন করে নিতে হয়। ফারিয়েলেরও আছে তেমন কিছু গল্প। হতে চেয়েছিলেন এয়ারফোর্সের পাইলট, কিন্তু ফারিয়েলের সময়ে মেয়েদের ফ্লাই করতে দেওয়া হতো না। এই প্রেক্ষিতেই বাংলাদেশ ফ্লাইং অ্যাকাডেমি থেকে প্রাইভেট পাইলট লাইসেন্স এবং কমার্সিয়াল পাইলট লাইসেন্স এর কোর্স শেষ করলেন। ২০০৭ সালে ইউনাইটেডে জয়েন করে, ২০১০ এ বাংলাদেশ বিমানে যোগদানের সুযোগ পেলেন। এখন পর্যন্ত ৮০০০ ঘন্টা উড়েছেন তিনি। বিনয়ের সাথেই মনে করিয়ে দিলেন, সামনে আরো অনেক পথ উড়ার বাকি আছে তার।

fariel ahmed

শক্তহাতে একজন পাইলটের মতোই নিজের জীবনের গতিপথ এবং ইচ্ছের ওপরে এত কঠিন নিয়ন্ত্রণ! অপার মুগ্ধতায় প্রশ্ন করি, পাইলট হিসেবে আপনার সবচেয়ে পছন্দের কাজ কী? ফারিয়েল মুহূর্ত দ্বিধা না করে উত্তর দিলেন, ”ল্যান্ডিং। কেননা এর পুরোটাই আমার হাতে, আর ওটাই আমার দক্ষতা। একজন পাইলটের পড়াশোনা, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, সবকিছু ফুটে ওঠে ল্যান্ডিং এর সময়। আমরা বলি, স্মুথ ল্যান্ডিং ল্যান্ডিং নয়, পজিটিভ ল্যান্ডিংই ল্যান্ডিং। রানওয়ের একদম সঠিক জায়গায় স্পর্শ করা, মাঝে এসে থামা, পরিবেশ ও পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারাটাই পজিটিভ ল্যান্ডিং। এখনো আমরা ম্যানুয়েল পদ্ধতিতেই ল্যান্ডিং করি। তাই, ফ্লাইটের সবচেয়ে সংকটপূর্ণ সময়টা সফলভাবে অতিক্রম করাটাই আমার কাছে বেশি আকর্ষনীয়।”

জীবনের অনেক কঠিন পর্যায় এভাবেই দৃঢ় হাতে সামলাতে হয়েছে ফারিয়েলকে। যখন মা হলেন, তখন মাতৃকালীন ছুটি ছিল ৩মাস মাত্র। ফারিয়েল ৩মাসের বেশি একদিনও ছুটি নেননি। তিনি চাননি সন্তান পুরোপুরি তাঁর ওপরে নির্ভরশীল হয়ে যাক। তাকেতো চাকরি করতে হবে সন্তানকে পাশে নিয়েই। বললেন, “শিশুদের বোঝার ক্ষমতা অসাধারণ। বুঝিয়ে বললে এমন কোন বিষয় নেই যা শিশু গ্রহণ করতে পারবে না। তাই মেয়ের সাথে দারুণ একটা বোঝাপড়ার সম্পর্ক হয়েছে আমার। বাবা, শ্বশুরবাড়ি, জাহিদ অনেক সমর্থন করেন। আর জাহিদ হাসান বললেন, ”তোমার নিজের স্যাক্রিফাইস কী কম?”

ফ্লাইট শেষে ঘরে ঢুকে ফারিয়েল এখনো নিজের হাতে ঘর গোছান, রান্না করেন, জাহিদ এবং ফারিজার সারাদিনের গল্প শোনেন। আনমনে বললেন, “মা থাকলে হয়তো কাজগুলো একটু সহজ হত। কিন্তু বাস্তবতা মেনে নিতেই হয়। কোনো কিছুর জন্যই থেমে থাকাটা জীবন নয়। পাইলটের কাজ একটু ঝুঁকিপূর্ণ শোনায় বটে, কিন্তু ঝুঁকি নেই কোথায়? মেয়েরা ট্রেনও চালাচ্ছে। এটিও তেমন। আমি বিশ্বাস করি, যে কাজ তোমার ভাল লাগে, যা তুমি ভাল পারো, সেটাই করা উচিত। বিষয় না সেটি বিমান চালানো কিংবা ট্রেইন চালানো। আর বিমান চালাতে না আসলে কখনো বোঝা যাবে না এই কাজ তুমি পারবে কী না। যদি ইচ্ছা থাকে, অবশ্যই বিমান চালাতে আসো। শেখো। বোঝার চেষ্টা করো পারছো কী না, ভাল লাগছে কী না। চেষ্টা না করে অহেতুক ধারণা নিয়ে বসে থাকার কোন মানে নেই তো। আছে কী?

লেখা: নেত্রা নন্দিতা

- A word from our sposor -

spot_img

মেয়েদের নিজের জায়গাটা অর্জন করে নিতে হয়: ফারিয়েল আহমেদ