LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বিগ্রেডিয়ার জেনারেল ডা. নুরুন্নাহার ফাতেমা বেগম বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত চিকিৎসক। চিকিৎসাশাস্ত্রে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন। এছাড়াও তিনি অর্জন করেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিকালীন সর্বোচ্চ পদক ‘সেনাবাহিনী’ পদক। পেশাগত এবং ব্যক্তিগত জীবনের অত্যন্ত সফল এই নারীর সকল অর্জনের পেছনে ছিল তার অক্লান্ত পরিশ্রম এবং পেশার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। ভাগ্যের জোরে তিনি এগিয়ে যাননি, প্রতিবার তিনি নিজে তাঁর ভাগ্য তৈরি করে নিয়েছেন।
তাঁকে নিয়ে লিখেছেন ডা. সিদ্ধার্থ দেব মজুমদার।

ডা. নুরুন্নাহার ফাতেমা বেগম, ২০১৯ সালের এক দুপুরে টেলিভিশনের একটি স্বাস্থ্যবিষয়ক অনুষ্ঠান শেষ করে বাসায় ফিরছিলেন। পরপর তার দুটি ফোন এলো। একটি ফোন মন্ত্রী পরিষদ সচিবের কাছ থেকে। তিনি অফিসিয়ালি তাকে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রাপ্তির খবরটা জানালেন। অন্য ফোনটি এলো সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল থেকে। একজন গুরুতর রোগীর দেখার অনুরোধ ছিল ফোনকলটিতে। ডা. নুরুন্নাহার তার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জনের কথাটি প্রিয়জনদের জানানোর সুযোগ করে উঠতে পারলেন না, তার সমস্ত মনোযোগ পড়ে রইল রোগী নিয়ে। গাড়ি ফিরিয়ে তিনি ছুটলেন সিএমএইচ এর দিকে। দ্রুত হাতে রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন। রোগীকে নিরাপদ করতে করতে কখন ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে খেয়াল করেননি। ততক্ষণে টেলিভিশনে স্বাধীনতা পুরস্কার যারা পেয়েছেন তাদের নাম ঘোষণা করা হয়ে গেছে।

সিএমএইচ এর ওয়ার্ডের টেলিভিশন থেকে সহকর্মীরা খবরটা জানলেন, জানলো সিএমএইচসহ পুরো বাংলাদেশ। এক একজন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনিতো আমাদের কিছু বললেন না? তিনি আর কী বলবেন! আনন্দ উদযাপনের চেয়ে রোগীর জীবনটা যে তার কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি নীরবে সবার শুভেচ্ছা গ্রহণ করলেন এবং ঠিক সেদিনই অসংখ্য মানুষ যখন ফোন করছেন, বাসায় আসছেন, সব কিছু উপেক্ষা করে ঠিক সময়ে তিনি রোগী দেখতে চলে এলেন ল্যাবএইডে। বিষ্ময় প্রকাশ করতেই তিনি হেসে বললেন, অনেক দূর দূরান্ত থেকে রোগীরা এসেছে। চেম্বারে না এসেই বা পারি কী করে! রোগীদের জরুরি পরামর্শ দিয়ে তারপর তিনি যান আনন্দ উদযাপনে।

Nurunnahar fatema

একটু পেছনে ফেরা যাক, তিনি যখন ইন্টারমিডিয়েটে তখন হঠাৎ করে তার মা মারা গেলেন। সেটি ছিল পরিবারের ওপর প্রথম আঘাত। ডা.নুরুন্নাহার বলছিলেন, আব্বা আম্মার মধ্যে খুব সখ্য ছিল। তারা একসঙ্গে রেডিও শুনতেন। আম্মা রান্না করার সময় আব্বা পাশে বসে গল্প করতেন। খুব সুখের একটা সংসার ছিল আমাদের। আম্মা মারা যাবার পর সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেল। আব্বা প্রতিদিন নামাজ পড়ে আম্মার কবরের পাশে যেয়ে বসে থাকতেন। আম্মার কবরের পাশে এক টুকরো জায়গা ছিল, তিনি বলতেন আমাকে এখানে রাখবে। তিনি ভয় পেতেন- সেখানে না যেন অন্য কারো দাফন হয়ে যায়। ঠিক ৯ মাসের মাসের মাথায় তার কর্মস্থলে বসে তিনি হার্টঅ্যাটক করলেন। আর বাসায় ফিরলেন না। মায়ের পাশে তাঁর জায়গা হলো।

একটানা কথা বলে এবার একটু সময় নিলেন ডা. নুরুন্নাহার ফাতেমা। তার গলা ভারী হয়ে ওঠলো, কিন্তু সামলে নিলেন তিনি, ঢেকে দিলেন তাঁর পেশাদারিত্বের আড়ালে। কিন্তু পরিবেশটা আদ্র হয়ে থাকলো।

তারপর সবকিছু হয়েছে তার নীরবে। বাব মা হারানোর শোককে তিনি পাশে রেখে পড়াশোনায় আরো পরিশ্রমী হয়ে উঠলেন। সিলেট এমসি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েটে অসম্ভব ভালো ফলাফল করলেন। তারপর ভর্তি হলেন সিলেট মেডিকেল কলেজে। খরচ বাঁচাতে হোস্টেলে ওঠা হয়নি। বাসায় থেকে পড়াশোনার কাজ চালিয়ে নিয়েছেন। তবে নিরিবিলি থাকলেও ফলাফল যখন বের হতো সেটি হতো একটা সশব্দে ঢাক বেজে ওঠার মতো। মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের প্রফেশনাল পরীক্ষায় তিনি দ্বিতীয় হয়েছিলেন। এফসিপিএফসহ সকল ক্ষেত্রে তার মেধা দ্যুতি ছড়িয়েছে। সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান কার্ডিয়াক সেন্টারে তিনি এতটাই অপরিহার্য হয়ে ওঠেন যে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেনাবাহিনীর ডিজিএম এর কাছে তাকে রেখে দেওয়ার অনুরোধ করেন!

আজ বাংলাদেশের প্রথম পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্ট হিসেবে যে নামটি বাংলাদেশর চিকিৎসা শাস্ত্রের পাতায় জ্বল জ্বল করে জ্বলছে, সেটি ডা. নুরুন্নাহার ফাতেমা বেগম।

ছবি: রফিকুর রহমান রেকু

- A word from our sposor -

spot_img

তবুও অপরাজিতা নারী