LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাংগঠনিক কাজে একদিন জেলখানা পরিদর্শনে যান সালমা চৌধুরি। সেখানে অবস্থানরত শিশুদের দেখে জেলারকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন ওরা ভ্রাম্যমান পথশিশু। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ওদের জেলে এনে রাখা হয়েছে। এই শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা জাগে ইডেন মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগের এই অধ্যাপিকার মনে। এই শঙ্কা থেকেই গাজীপুরে গড়ে তোলেন “সেইফ হোম ফর গার্লস” নামক সংস্থাটি। যেখানে রাস্তা থেকে অসহায়, দুঃস্থ, গর্ভবতী নারী ও শিশুদের এনে খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের পাশাপাশি শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কাজের ব্যবস্থাও করা হতো যেন তারা নিজেরা সাবলম্বী হয়ে একটি সুন্দর জীবন পায়।

প্রচন্ড মেধাবী ও মানবিক এই নারী মানুষ হিসেবে যেমন অসাধারণ তেমনি মা হিসেবেও তিনি রত্গনর্ভা। ৫ কন্যা ও ২ পুত্রের প্রত্যেকেই যেন ব্যক্তি সালমা চৌধুরীরই বাস্তব প্রতিফলন। যেহেতু তিনি বাংলার প্রভাষক তাই চাইতেন সন্তানেরা কেউ একজন অন্তত বাংলায় পড়ুক। কিন্তু বাংলাতে না পড়লেও সন্তানদের প্রত্যেকের মধ্যেই দ্যুতি ছড়িয়ে যাচ্ছে তাদের মায়ের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা।

সালমা চৌধুরীর বড় মেয়ে জয়নাব ফারুকী আলী এবং মেজো মেয়ে মরিয়ম ফারুকী আলীর সাথে কথা হচ্ছিলো সুখে অসুখে প্রতিনিধির।

জয়নাব ফারুকী আলী বর্তমানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ছোটোবেলা থেকে এস্ট্রোনাট হওয়ার স্বপ্ন থাকলেও একটি এক্সিবিশনই যেন জীবন বদলে দিয়েছিলো তার। বুয়েটের আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক আয়োজিত এই এক্সিবিশনে এসে প্রচন্ড মুগ্ধ হয়ে স্থাপত্যবিদ্যা নিয়ে পড়াশুনা করার আগ্রহ তৈরি হয়। সেই আগ্রহ থেকেই ১৯৭৫ সালে নিজের পছন্দের বিভাগে ভর্তি হন তিনি। পরের বছরই স্বামীর সাথে আমেরিকা পাড়ি জমান। সেখানে ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি তে একইবিভাগে চালিয়ে যান পড়াশুনা।

১৯৮৮ সালে দেশে ফিরে আবারও বুয়েটে যোগদান করেন জয়নাব ফারুকী। তবে এবারে পড়তে নয়, পড়াতে। টানা ১১ বছর বুয়েটে শিক্ষকতা করার পর চলে আসেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরই মাঝে শিক্ষাছুটি নিয়ে পাঁচ বছর স্থাপত্যবিদ্যা পড়িয়েছেন সৌদিআরবে। গবেষণা করেছেন সৌদিআরবের বিভিন্ন স্থাপনা নিয়ে। দেশে আসেন ২০১৮ তে।

জয়নাব ফারুকী আলী ইংল্যান্ডের আর্কিটেকচারাল এসোসিয়েট স্কুল থেকে ২০০০ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। স্থাপত্যবিদ্যা নিয়ে তার অনেকগুলি গবেষণা পত্র আছে। অর্জন করেছেন ‘এক্সেলেন্স ইন দি স্ট্যাডি অব আর্কিটেকচার’, ‘এক্সেলেন্স ইন ডিজাইন’ সহ অসংখ্য এওয়ার্ড।

জীবনে চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে মা সালমা চৌধুরী থেকে পাওয়া শিক্ষা, সততা, আত্মবিশ্বাস এবং কাজের প্রতি একনিষ্ঠতা। কর্ম ও ব্যক্তিজীবনে সবসময় বন্ধুর মতো পাশে ছিলেন তার স্বামী। বাংলাদেশের মেয়েদের নিয়ে ভীষণ আশাবাদী তিনি। শিক্ষাকতা করতে গিয়ে কর্মে-মননে-ব্যক্তিত্বে এদেশের মেয়েদের বিকাশ যেন প্রতিদিন নতুনভাবে ধরা পড়ে তার চোখে। প্রতিটা মেয়ে যেন স্বাবলম্বী হয় সেই লক্ষে কাজ করছেন মায়ের হাতে শুরু হওয়া সংস্থা “সেইফ হোম ফর গার্লস” নিয়েও। প্রচন্ড সংস্কৃতিমনা এই মানুষটি শিক্ষকতার পাশাপাশি একজন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী।

সালমা চৌধুরীর মেজো মেয়ে মরিয়ম ফারুকী স্বাতী। পেশায় চিকিৎসক। সারাদেশে গাইনি ও অবসেস্টট্রিক বিষয়ে যে কজন চিকিৎসক খ্যাতি অর্জন করেছেন সে তালিকায় অন্যতম তিনি। বর্তমানে কাজ করছেন ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতালে। দুর্দান্ত মেধাবী এই মানুষটির স্বপ্ন ছিলো পাইলট হওয়া। কিন্তু চোখে সমস্যার কারণে সে স্বপ্নে চিড় ধরে ছোটোবেলাতেই। উচ্চমাধ্যমিকে ঢাকা বোর্ডে চতুর্থ হন তিনি। বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষায় মেধা তালিকায় সেরা দশের ভেতর থাকলেও খালু জাস্টিস আব্দুল্লাহ জাবিরের পরামর্শে ভর্তি হোন ঢাকা মেডিকেলে। এরপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি তার।

তবে ক্যারিয়ারের শুরু থেকে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সাপোর্ট ছিলো অবাক করার মতো। স্বামী শামীম আহমেদ নিজেও পেশায় ডাক্তার। গাইনি বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্র্যাকটিস শুরুর পরপরই মা হন মরিয়ম ফারুকি। শ্বাশুড়ি ছেলেকে সাফ জানিয়ে দেন যেহেতু বৌমা গাইনি বিশেষজ্ঞ, তার ব্যস্ততা বেশি তাই ছেলেকে পেশা পরিবর্তন করতে হবে। স্ত্রীকে সাপোর্ট দিতে এবং সন্তানদের সময় দিতে নিজে চিকিৎসা পেশার পরিবর্তে পাবিøক হেলথে কাজ করা শুরু করেন।

মাকে আইডল হিসেবে মানলেও স্বামী আর শ্বশুরবাড়ির এই উদারতা ছাড়া হয়ত কিছুটা কঠিন হতো তার এই যাত্রা। শুরু থেকে এখনো পর্যন্ত তার সবথেকে বড় সমর্থক, বন্ধু, উপদেষ্টা হিসেবে স্বামী শামীম আহমেদকে পেয়েছেন পাশে। ইদানিং কর্মজীবনের বাইরে সবটুকু জুড়ে আছে তার তিন নাতনি জোয়া-ইনারা ও আনায়া। ব্যক্তিগত ও পেশাগত দু জায়গাতেই ভীষণ হাসিখুশি, উচ্ছ্বল মানুষ তিনি। বললেন নারী বা পুরুষ যাই হোক না কেন, জীবনে মানুষের ভালোবাসার থেকে বড় কোনো অর্জন হতে পারে না। নিজে সৎ থাকতে হবে, নিজের কাজের প্রতি ডেডিকেশন থাকতে হবে। মানুষকে ভালোবাসার কোনো বিকল্প নেই। তার এই কথার প্রতিফলন দেখা যায় গাইনি এন্ড অবসেস্টট্রিক বিভাগের সকল কর্মচারিদের সাথে তার ব্যবহার ও কথোপকথনে। যেন কাজের জায়গাটিও আরেকটি পরিবার তার।

চিকিৎসা ও স্থাপনা দু জায়গাতেই আলো ছড়িয়ে আছেন সালমা চৌধুরীর দু কন্যা। এছাড়া অন্যন্য সন্তানেরাও প্রত্যেকে সুপ্রতিষ্ঠিত। সুশিক্ষা আর স্বশিক্ষার এক চমৎকার সংমিশ্রণ যেন এই দু বোন।

- A word from our sposor -

spot_img

রত্নগর্ভা মায়ের দুই কন্যা