LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সবসময় দেশের বাইরে পড়তে চাওয়া টিনা জাবীন রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ৩য় বর্ষে উঠে ঠিক করলেন, আর নয়। এখনই সময় নিজের স্বপ্নের পেছনে সময় দেওয়ার। সেই ‘স্টার্টআপ ডিসিশন’ই টিনা জাবীনকে নিয়ে এসেছে বাংলাদেশ সরকারের অন্যতম যুগান্তকারী উদ্যোগ, স্টার্টআপ বাংলাদেশ এর ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠানের প্রধান ব্যবস্থাপনা পরিচালকের চেয়ারে। এর পেছনে আছে বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা আর অদম্য আত্মবিশ্বাস।

গুলশান-১ এ বিকেলের রোদ তখন হলুদ হয়ে এসেছে। কাঁচে ঘেরা লাউঞ্জে বসে, পরিচিত হাসিমুখে টিনা জাবীন খুললেন তার জীবনের পাতা। শুরু হল তার প্রফেশনাল বায়ো দিয়ে। “প্রাইস ওয়াটারহাউস কুপারস থেকে সিপিএ লাইসেন্সিং করার পর ১৩ বছর ওখানেই চাকরি করি আমি। এরপর ফাইন্যান্স ডিরেক্টর হিসেবে যোগদান করি বিশ্বের অন্যতম প্রিমিয়ার প্রাইভেট ইক্যুইটি ফার্ম, হর্সলি ব্রিজ পার্টনার্স এ। এয়ারবিএনবি, ফেসবুক, গুগল, উবার ইত্যাদির প্রথম ইনভেস্টমেন্ট করেছিল এই কোম্পানি। এদের প্রায় ৩০০০ স্টার্টআপস এবং ৪৫০টি পার্টনার ইনভেস্টমেন্টের এভালুয়েশন করেছি আমি এবং আমার টিম, যার মূল্য ছিল প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার।”

টেকবিশ্বের রাজধানী ছেড়ে ২০১৬ সালে টিনা জাবীন বাংলাদেশে চলে আসেন। বিষয়টা কেমন ছিল ওনার জন্য? “খুব কঠিন কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না আসলে। আমেরিকাতে থাকলেও দেশের জন্য একটা টান এবং দেশে ফিরে আসার প্ল্যান সবসময়ই আমার মাথায় ছিল। এভাবেই একদিন মাননীয় আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক আমাকে স্টার্টআপ বাংলাদেশ ক্যাম্পেইনে যুক্ত করেন, যেখানে আমি ইনভেস্টার অ্যাডভাইজর হিসেবে কাজ করি। ২০১৭ সালে আমরা সিলিকন ভ্যালিতে স্টার্টআপ বাংলাদেশের সফট লঞ্চ করি। এই স্টার্টআপ বাংলাদেশের অংশ হিসেবেই এর মাঝে ইক্যুইটি ফান্ডিংয়ের জন্য স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড নামে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডটি প্রতিষ্ঠিত হয়। আমি বর্তমানে এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছি।”

টিনা যোগ করলেন, “এখানে একটা ব্যাপার না বললেই নয়। বাংলাদেশের মতো উঠতি একটি দেশে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম তৈরি এবং অনলাইন ভিত্তিক উদ্যোক্তাদের সাপোর্ট করার জন্য এইরকম একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার যে ভিশনটা দেখেছেন, ওনার আইসিটি অ্যডভাইজর, সজীব ওয়াজেদ জয় যে প্ল্যানিং করেছেন এবং মাননীয় আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক এই ভিশন ও প্ল্যানগুলোকে যেভাবে বাস্তাবায়িত করছেন, এটা আমাদের সবার জন্য অনেক বড় একটা ব্যাপার।

Tina F jabeen

“আমরা যে উদ্যোক্তাদের নিয়ে কাজ করছি তারা মূলত অনলাইনভিত্তিক কাজ করেন। আমরা যখন শুরু করি তখন বাংলাদেশের ইকোসিস্টেমে প্রায় ৩০০ স্টার্টআপ ছিল। গত ৪ বছরে সরকারি ফান্ড যোগ হওয়ার ফলে সেটা বুস্ট হয়ে ২৫০০তে অ্যাকটিভ স্টার্টআপসে এসে দাঁড়িয়েছে। পাঠাও, সেবা, শপআপ, সহজসহ প্রায় এক হাজার স্টার্টআপের ফলে গত ৪ বছরে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এছাড়া ৪২টারও বেশি অ্যক্সিলারেটর হয়েছে। প্রায় সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্যোক্তা ক্লাব হচ্ছে।”

টিনা জাবীনের নানী, মহিবা খাতুন কলকাতার লেডি ব্র্যাব্রোর্ন কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন ১৯২০ সালে, যখন আমেরিকায় নারীদের ভোট দেওয়ারও অধিকার ছিল না। মা ছিলেন ডাক্তার, বাবা জজ। একটি উদার এবং শিক্ষিত পরিবারে বেড়ে ওঠা টিনার মধ্যে অন্যদের জন্য কিছু করার চাপ ছিল ছোট থেকেই। “আমাদের পরিবারে মেয়ে এবং ছেলে সবাইকেই একদিন অন্যদের জন্য কিছু একটা করতে হবে এই মূল্যবোধ নিয়ে সমানভাবে বড় করা হয়েছে। আমার নানীর পল্লী উদ্যোগ কেন্দ্র নামে ভলান্টিয়ার অ্যাসোসিয়েশন ছিল।”

দেশের ভেতরে এবং বাইরেও সমান তালে কাজে সাফল্য তুলে আনার জন্য টিনা জাবীনের পরামর্শ একটিই, যে কাজই করছেন তার সেরাটা তুলে আনা। টিনা জাবীনের ভাষায় “আমি যখন কাজ করি তখন একটি টার্গেট নিয়েই কাজ করি। যে কাজই করছেন তার সবচে সেরাটা বের করে আনলে আপনি আর দশজনের সামনে চলে আসবেনই।”

“আমার মনে পড়ে, আইডিয়ার শুরুর দিকে মানসিক সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার জন্য মনের বন্ধু নামে একটি আইডিয়া আমরা পেয়েছিলাম যার উদ্যোক্তা ছিলেন ২জন নারী।” টিনা বলেন, বাংলাদেশের নারীদের স্টার্টআপ আইডিয়া থাকলেও সেটা কীভাবে বিজনেসে রূপান্তরিত করতে হবে সেই টেকনিক্যাল আইডিয়া কম। আমরা অলিখিতভাবে চেষ্টা করি অন্তত ২০ শতাংশ ফান্ডিং নারীদের জন্য বণ্টন করতে।

উদ্যোগ সবাই নেয়, কিন্তু সফল স্টার্টআপের সাথে তার সূত্র মেলানো কঠিন। টিনা জাবীন মনে করেন, স্টার্টআপে সফল হতে হলে প্রথমে জানতে হবে আসলেই আপনার মাঝে উদ্যোক্তার ডিএনএ আছে কী-না। “সবাই করছে তাই আমিও করবো এভাবে স্টার্টআপ হয় না। জানতে হবে, যে প্রোডাক্ট নিয়ে আমি শুরু করব আসলেই তার চাহিদা আছে কি-না। শতভাগ নিশ্চিত হতে হবে এই উদ্যোগের পেছনে যদি সর্বস্বও যায়, আমার লেগে থাকার প্যাশনটা থাকবে কি-না। আর কোনোভাবেই সফল না হলে, বিজনেস বন্ধ করার বা অন্য কারো সাথে কোলাবরেশন করার উদ্যমটা আছে কি-না। কিন্তু অসম্পূর্ণ ব্যবসায় ফেলে রাখতে নেই।”

টিনা জাবীন মনে করেন, সফলতার জন্য নিজেকে ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা করতে জানা খুব জরুরি। অন্যের স্বীকৃতির আশায় বসে থাকলে কখনো নিজের কাজ শেষ করা যায় না। “আমি সেই নারীদের সম্মান করি যারা একসাথে মা, বোন, মেয়ে, এবং স্ত্রীর ভূমিকা পালন করছেন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে সফল হতে নারীর মধ্যে আরো কিছু গুণ তৈরি করে নিতে হবে। প্রথমত, আত্মবিশ্বাসী হওয়া। দ্বিতীয়ত, আমি মহিলা এই কথাটাকে কোথাও এক্সকিউজ হিসেবে ব্যবহার না করা।”

লেখা: নেত্রা নন্দিতা

- A word from our sposor -

spot_img

সফল হতে হলে উদ্যোক্তার ডিএনএ থাকা জরুরি: টিনা জাবীন