LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

প্রায় এক দশক পর দেখা। সেই হাসিমাখা মিষ্টি মুখ। না কোনো মেক-আপ। না কোনো স্নো-পাউডার। চুলে একটু পাক ধরেছে, এই যা। এছাড়া ছোট-খাটো, হালকা-পাতলা মানুষটির যেন পরিবর্তন হয়নি একটুও। কী আশ্চর্য!

বললেন, “এই জুনে বয়স ৭৫ হবে!” অবাক, দেখে বোঝার সাধ্যি কার?

বললেন, “সারাদিন আমি প্রচুর ফল খাই। বলতে গেলে ফলের ওপরই থাকি। সব সিজনের সব ফল। তবে ডায়াবেটিসের কারণে আমটা কম খাওয়া হয়।”

ফলই কি তাহলে বয়স ধরে রাখার রহস্য?

হাসত হাসতে বললেন, “কি জানি। গড়নটাও তো ছোট-খাটো। এটাও হতে পারে! হাঁটাহাঁটি্ও তো করি!”

কথা হচ্ছিল দেশের প্রথিতযশা কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের সঙ্গে। সেলিনা হোসেনের পরিচয় দিতে গিয়ে বেশি কিছু বলার দরকার পড়ে না। তাঁর পরিচয় তিনি নিজেই। তাঁর সাহিত্য নিয়ে ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০টা পিএইচডি হয়েছে। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এক ছাত্রী তাঁর উপন্যাসের বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন ২০১৬ সালে। সেলিনা হোসেন বলেন, “এটা আমার কাছে পুরস্কারের চেয়েও বেশি পাওয়া। এই খবরটি জানার পর মনে হলো, আমার সব অর্জন শেষ হয়েছে। আর কিছু পাওয়ার নেই।”

দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক সাহিত্য অঙ্গনে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে আরো আগে। ভারতের ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর উপন্যাস পাঠ্য। ইংরেজিতে অনুদিত হয়েছে অন্তত ১১টি উপন্যাস। এছাড়াও ফরাসি, জাপানি, কোরিয়ান, রুশ, উর্দু, হিন্দি, মালয়ালাম, মারাঠি, ফিনিস, আরবি, অসমিয়া, উড়িয়া ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর গল্প-উপন্যাস। এটাও কি কম বড় পাওয়া?

লেখালেখির শুরুটা হয় ১৯৬৪ সালে। তখন তিনি রাজশাহী মহিলা কলেজে পড়েন। তাঁর ভাষায়, “ওই সময় রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার একটি আন্তঃকলেজ সাহিত্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন। সেখানে কলেজ থেকে আমার নামটা পাঠানো হয়েছিল সাতটি বিষয়ে। আর ওই সাতটির মধ্যে একটি ছিল গল্প লেখা। ছোটবেলা থেকেই ডায়রি ভর্তি করে কবিতা লিখতাম। টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে খাম কিনে সেগুলো বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপাতেও দিতাম। কিন্তু গল্প তো লিখিনি কখনো। স্যারদের বললাম, কী করে গল্প লিখব? স্যার বললেন, চেষ্টা করো, ঠিক পারবে। কয়েকদিনের চেষ্টায় অবশেষে একটা গল্প লিখেও ফেললাম। প্রতিযোগিতায় ওই গল্পটিই প্রথম হলো। সেটাই আমার প্রথম লেখা।”

কিন্তু কথা হচ্ছে, সেলিনা হোসেন তো অন্য কিছুও হতে পারতেন, লেখক হলেন কেন?

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় অভিনয় করতাম, আবৃত্তি করতাম, গিটার বাজাতাম। মনে হচ্ছিল, সবকিছু একসাথে করে যাব। কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে পাশ করার পরে ভাবলাম, লেখক হব।”

কারণ লেখক হওয়ার জন্য যতটুকু দরকার তা তিনি পেয়েছিলেন প্রকৃতি থেকে। তাঁর শৈশব-কৈশোরে। প্রকৃতিই তাকে লেখক করে তুলেছে। প্রকৃতি থেকে যে জ্ঞানটা, যে অভিজ্ঞতাটা তিনি সঞ্চয় করেছিলেন, সেটাই তাকে এই পথে তাড়িত করেছে। ফলে তিনি ভেবেছিলেন, গল্প-উপন্যাসে প্রকৃতি তাঁর একটা অসাধারণ চরিত্র হতে পারে। তিনি বলেন, “অভিজ্ঞতা থেকেই আমার লেখালেখির ভিতটা শুরু। আমার ছিল দূরন্ত এক সোনালি শৈশব। তখন আমি মাঠেঘাটে, নদীতে, বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোর অবাধ স্বাধীনতা পেয়েছি।”

আর তিনি দেখেছিলেন, মানুষের সঙ্গে মানুষের বিচিত্র সম্পর্ক। তাদের জীবন যাপন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি শিখেছিলেন সেই চরিত্রগুলো বিশ্লেষণ করতে। কারণ তখন তিনি পড়াশোনা করতেন অনেক। তাঁর ভাষায়, “ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে বিরতিতে সবাই যখন আড্ডা দিত, চা খেত, তখন আমি সোজা চলে যেতাম লাইব্রেরিতে। পড়তাম বিভিন্ন বই। মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিন থেকে শুরু করে আধুনিক সাহিত্যের নানা কিছু আত্মস্থ করেছি সেই সময়ে। দেশীয় সাহিত্য পড়ার সূচনাও তখন। এই সব কিছুই আমাকে লেখালেখিতে আসার প্রেরণা দিয়েছে।”

কবিতা দিয়ে শুরু হলেও, উপন্যাস কেন? বললেন, “যে বড় ক্যানভাসগুলো আমার অভিজ্ঞতার সঞ্চয়ে ছিল, সেখানে গল্পও নয়; বরং আমার মনে হয়েছিল আরো বিস্তৃত পরিসর দরকার, যেখানে জীবনের সবটুকু উঠে আসবে। সেজন্য উপন্যাসটাকেই আমি প্রধান করেছি। বেছে নিয়েছি।”

তবে তাঁর সফলতার ভিত্তি কিন্তু পরিবারই। অন্যরকম একটা পরিবার পেয়েছিলেন তিনি। বাবা চাকরি করতেন। মা গৃহিনী। কিন্তু মায়ের ছিল প্রচুর পড়াশোনা। ছেলে-মেয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। সবাইকে পড়াশুনা করতে হবে। মেয়েদের তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে পার করবেন, সেই মানসিকতা ছিল না। একটা উদাহরণ দিলেন, “নবম সন্তান জন্মের সময় মা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। সন্তানটিও মারা যায়। বড় দু’বোন পড়তেন ভারতেশ্বরী হোমসে। স্কুল ছুটি হলে তারা এলেন বাড়িতে। বললেন, মা সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত স্কুলে ফিরে যাবেন না। কিন্তু মা ছিলেন বেশ কড়া। বললেন, ছুটি শেষ হওয়ার পর, একদিনও থাকতে পারবে না। পড়াশুনা সবার আগে।”

বিয়ের পর, তিনি পেয়েছিলেন স্বামীর সমর্থন, সহযোগিতা। সন্তানদের উৎসাহ। তাঁর স্বামী আনোয়ার হোসেন। নয় নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন। বললেন, “আনোয়ার আমাকে সাপোর্ট করেছেন সবসময়। কখনো কোনো ধরনের বিরোধিতা করেননি। আমি তো বেশিরভাগ সময় টেবিলেই থাকি, লেখালেখি নিয়ে। ঠিকমতো রান্নাও করতে পারতাম না। তখন বরং আনোয়ার বলতেন, রান্না তো কাজের বুয়াও করতে পারে!”

তবে তিনি বাচ্চাদেরকে অখুশী করে কখনো কোনো কাজ করেননি। বাচ্চাদের সব ধরনের আবদার মিটিয়েছেন। ওদের জন্য আলাদা বাজেট রাখতেন। দু’জনেই বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরতেন। সময় দিতেন।

“নিজের চোখে না দেখে, শুধু কল্পনায় আমি কোনো চরিত্র তৈরি করি না। একটা মানুষের বেদনা বা জীবন যাপন লিখতে গেলে, সেগুলো তো দেখতে হবে, না? শুধু কল্পনা দিয়ে একটা ফাঁপা জিনিস তৈরি হবে। সেটা আমি কখনো করতে চাইনি। যখনই কোনো গল্প বা উপন্যাস লিখি। তখনই সেই পটভূমিটা ভিজিট করি। আর আমাকে কখনোই একা ছাড়তেন না আনোয়ার। সবসময় সাথে যেতেন। বিমানে চাকরি করতেন। ছুটি নিয়ে সাথে যেতেন। বনে-বাদারে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে তিনিই ছিলেন আমার একমাত্র সঙ্গী। তখনও। এখনও। তাই পেশার সাথে সঙ্গী নির্বাচনও ভীষণ জরুরি।”

তবে স্বীকার করলেন, সন্তানরা যখন ছোট থাকে তখন কর্মজীবী মায়েদের মানসিক অস্থিরতার কথা। তিনি বাংলা একামেডিতে চাকরি করতেন। গবেষণা সহকারী হিসেবে। ১৯৭০ সাল থেকে। ৯টা-৫টার চাকরি। তাঁর বাইরে লেখালেখি। বাচ্চারা ছোট। বললেন, “এ ক্ষেত্রেও আমার ভাগ্য ভালো বলতে গেলে। কঠিন সময়ে আমি পেয়েছি মায়ের সমর্থন। পেয়েছি শাশুড়ির সমর্থন।”

এই সময়ের লেখকদের বললেন, প্রচুর পড়াশোনা করতে। “আমি তো নতুন লেখক যারা আছে তাদের বই পড়ি। কী লিখছে, সাহিত্যের ট্রেন্ডটা কোথায় যাচ্ছে, তা তো জানতে হয়।”

নতুনদের বললেন, সময়টাকে ধারণ করতে। “আমি যেমন ষাটের দশকে লেখা শুরু করলাম। সেই সময় আর এই সময়টা তো এক নয়। এই সময়টা নতুনরা তাদের মতো করে ধারণ করবে। আর আমি একজন বয়সী মানুষ হিসেবে এই সময়কে অন্যভাবে দেখব। কাজেই নতুনদের দায়িত্ব সময়কে বুঝে, পরিবেশকে বুঝে, মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক বুঝে, অর্থনীতির জায়গাটা বুঝে, সব দিক থেকে এগোতে হবে।”

সেই সঙ্গে অতীতের সাথে বর্তমান সময়টাকে মেলানোও গুরুত্বপূর্ণ। বললেন, “চর্যাপদের পটভূমিতে আমি ‘নীল ময়ূরের যৌবন’ উপন্যাস লিখেছি। সেখানে ‘কনটেম্পোরারি প্যারালাল’ সাহিত্যের থিওরিটা ব্যবহার করেছি। অতীতকে ধরেছি। সেটা বর্তমানের সাথে সংযুক্ত করেছি। আর এই কারণেই ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে এই উপন্যাসটা পাঠ্য।

“শুধু যারা লেখালেখি করতে চান তারাই নন, বরং যে যে কাজটাই করতে চান না কেন, পুরোপুরি মনোযোগটা দিতে হবে সেখানেই। আমি যা করি। রাতদিন টেবিলে থাকি। বা লেখার প্রয়োজনে ঘুরে বেড়াই। শিল্পকলার সব শাখায়। যে যে কাজটা করছে, পুরোপুরি মনোযোগ দিতে হবে সেখানে। সাময়িক বিরতি নেবে। আবার শুরু করবে। সিদ্ধান্তটা নিতে হবে। তারপর লেগে থাকতে হবে। অনেক কিছু শুরু করলাম। মনোযোগটা কোথায় দেব?”

তাঁর বইয়ে নারীবাদ এসেছে চ্যালেঞ্জ হিসেবে। তিনি নিজেও কি সেই চ্যালেঞ্জের অংশ নন? বললেন, “নারী বলে আমি কোনো সুযোগ পাইনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে বিরোধিতাই পেয়েছি। তবে আমি জায়গা করে নিতে পেরেছি। আমাকে জায়গা করে নিতে হয়েছে। আর সে কারণেই আমি কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে থাকিনি। আমার চরিত্রগুলো হয়েছে নানা বর্ণের, নানা ধর্মের, নানা রঙয়ের।”

শেষে বললেন, “লেখকের কোনো জেন্ডার নেই। লেখা দিয়েই তাকে জায়গা করে নিতে হবে।”

লেখা: সুলতানা স্বাতী
ছবি: রফিকুর রহমান রেকু

- A word from our sposor -

spot_img

লেখকের কোনো জেন্ডার নেই: সেলিনা হোসেন