LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

কোনো এক দুপুরে অনন্যা কল্যাণ সংগঠনের অফিসের নিচে আগুন লেগে গেল। ডনাই প্রু নেলী’র নিজের হাতে সাজানো ছোট্ট অফিস। আশপাশের দোকান পুড়ে ছাই। নেলী যখন খবর পেয়ে অফিসে ছুটে এলেন, ততক্ষণে পানির পাইপ ফেটে আগুন নিভে গেছে। তবু দুঃশ্চিন্তা যায় না। কিছুদিন আগেই দামি একটা প্রিন্টার লাগিয়েছেন। দুস্থদের জন্য নিজের পয়সায় কেনা স্যান্ডেল, পিরানগুলো অফিসেই থাকে। ফিরে পাওয়া যাবে কি?

অফিসে এসে দেখলেন, আগুনে ক্ষতি হয়নি একফোঁটাও। কিন্তু প্রিন্টারটা নেই। একটু মন খারাপ হলো। কিছুক্ষণ পর অফিসের পাশের এক প্রতিবেশি প্রিন্টারটি নিয়ে হাজির। মুখে হাসি। বললেন, আপা, ক্ষতি হওয়ার আগেই আমি সরিয়ে রেখেছিলাম। যেন না হারায়। এগুলো যে আপনার কাজের জিনিস, আমরা তো বুঝি!

সারাজীবন মানুষের জন্য কাজ করে আপনি কী পেলেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে নেলী প্রায়ই এই ঘটনাটি বলেন। স্রষ্টা চাননি তাঁর অফিসের ক্ষতি হোক। আশেপাশের মানুষ নিজ দায়িত্বে তাঁর অফিসের জিনিসপত্র রক্ষা করেছেন। বান্দরবানের মানুষ তাকে ভালোবেসে ‘মানবাধিকার আপা’ নামে ডাকে। একজীবনে কয়জন মানুষ এই আশীর্বাদটুকুর দেখা পান?

অবশ্য, এই ভালোবাসা একদিনে আসেনি। স্বর্গত বোমাং রাজা ক্যসাইন প্রু চৌধুরীর মেয়ে হিসেবে জন্ম থেকেই তিনি একজন রাজকন্যা। মা ছিলেন বান্দরবানের অন্যতম সম্পদশালীদের একজন। জন্ম থেকেই নেলীর চলাফেরা, আচরণ এবং পড়াশোনা, সবই ছিল রক্ষণশীল মায়ের নিয়মের শেকলে বন্দি। কিন্তু সবাইকে মায়া করা, ভালোবাসা, সেসবও তো মাকে দেখেই শেখা।

কিন্তু নেলীকে যিনি অধিকার, মুক্তি এবং সংগ্রামের অণুপ্রেরণা দিয়েছিলেন, তিনি তাঁর বাবা। তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও ছিলেন। সেই সুবাদে নেলী যার বেশি প্রয়োজন, তাকে সবার আগে সাহায্য করা শিখেছেন ছোটবেলায়ই।

সময় বদলায়। একসময় নেলী বুঝতে পারেন, ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে সবারই স্বাবলম্বী হওয়া প্রয়োজন। সাধারণ মানুষের কাতারে নেমে এসে একদিন যুবকল্যাণ অধিদপ্তরে প্রশিক্ষণ নিলেন। সেখানেই দেখলেন, স্পষ্ট ভাষায় কথা বললে মানুষ সম্মান করে। জীবনে প্রথম মনে হলো, আমিও নিজের জন্য, অন্যের জন্য কিছু করতে পারি। আত্নবিশ্বাস ফিরে পেলেন। নিজেই মুরগির ফার্ম খুললেন। নিজেই পরিষ্কার করতেন। ফার্মের প্রথম চালানে লাভ হলো মাত্র আড়াই হাজার টাকা। কিন্তু নেলী খুশি। নিজের উপার্জন বলে কথা। পরে দেখলেন, তাঁকে দেখে বান্দরবানের বেকার যুবকরাও মাছ, শাক-সবজি, হাঁস-মুরগির ফার্ম শুরু করেছে।

মাত্র ২০ হাজার টাকার অনুদান নিয়ে শুরু হলো অনন্যা কল্যাণ সংগঠন। সেখানে মেয়েদের সেলাইপ্রকল্প শুরু হলো, বিনা পয়সায় চিকিৎসা দেওয়া শুরু হলো। যুব দিবসে স্যানিটারি রিং বিতরণ শুরু হলো। এভাবেই পুরুষশাসিত সমাজের এক রাজকন্যা সাধারণের পছন্দের মানুষ হয়ে উঠলেন।

তবে নেলী মনে করেন, তার জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর একটি ছিল নারীপক্ষের দুর্বার নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত হওয়া। ২০০০ সালে প্রথম নারীপক্ষের অফিসে যাওয়া। ২০০৩ সালের মাথায় এই নেটওয়ার্কের প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নির্বাচিত হওয়া। শুরু থেকে টানা ৫ বছর বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া নেলী একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে চষে বেড়িয়েছেন। যৌনকর্মী, তৃতীয় লিঙ্গ, ধর্ষিতা এবং অধিকার বঞ্চিতদের জন্য কথা বলেছেন, কাজ করেছেন। ২০০৫ সালে মনে হলো, এবার ঘরে ফেরা প্রয়োজন। নিজের এলাকার মেয়েদের, নারীদের জন্য কিছু করা প্রয়োজন। ঘরে ফিরে এলেন। সমাজসেবা অধিদপ্তরের রেজিস্ট্রেশন, বাবার কাছে রুম আর মায়ের চায়ের ফ্লাক্স, একজন স্টাফ আর কিছু ভলান্টিয়ার নিয়ে শুরু করলেন নিজের এলাকার মানবাধিকার উন্নয়নের যাত্রা। এই মুহূর্তে নেলী ব্যস্ত প্রায় ২৪০০ কিশোরী নিয়ে। তাদের নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, যৌনপ্রজনন শিক্ষা, যৌনস্বাস্থ্য, লৈঙ্গিক সমতার বোধ উন্নয়ন নিয়ে কাজ চলছে দিনরাত। সম্প্রতি ‍শুরু করেছেন অশীতিপর বৃদ্ধদের জন্য খাবার পৌঁছে দেওয়ার কাজ। একই সাথে তিনি সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন বান্দরবান জেলার সভাপতি। পারিবারিক জীবনে তিনি একজন স্ত্রী ও ২ সন্তানের জননী। নিজের প্রয়োজনেই দুইদিকে ভারসাম্য রেখে চলা শিখেছেন। কোনোটাই যে ছাড় দেওয়ার মতো নয়!

খুব ছোটবেলায় নেলী বাবার কাছে ফুল-লতা-পাতা আঁকা পোস্টার চেয়েছিলেন। তাঁর বয়সী সব মেয়ের মতো ঘরের দেয়ালে সাজাবেন বলে। বাবা এনে দিয়েছিলেন মাদার তেরেসার পোস্টার। সেখানে লেখা ছিল, If we pray, we will believe; If we believe, we will love; If we love, we will serve. ছোট্ট নেলী এসব বুঝতেন না। খুব মন খারাপ করেছিলেন। বাবা মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, সমস্যা নেই। বড় হলে বুঝবে। এখন নেলী জানেন, ওটা শুধু পোস্টার নয়, বাবা তাঁকে তাঁর জীবনের মন্ত্র দিয়েছিলেন। ওই মন্ত্রেই বাজছে নেলীর সুর। আর তার রেশ ছড়িয়ে পড়েছে লোকালয়ে, জনপদে, আমাদের মনে। সেই সুর এখনো বাজছে, বেজেই চলেছে।

লেখা: নেত্রা নন্দিতা

- A word from our sposor -

spot_img

ডনাই প্রু নেলী আমাদের মানবাধিকার আপা